রেজিস্ট্রেশন আইন সংশোধন অধ্যাদেশঃ পুরোনো আইন বনাম নতুন বিধান
রেজিস্ট্রেশন আইন সংশোধন অধ্যাদেশ নিয়ে আজকের তুলনামূলক আইনি আর্টিকেল তৈরি করা হয়েছে। নতুন অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে কোন কন বিধান গুলো পরিবর্তন করা হলো এবং আগে কি বিধান ছিল এ নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করা হলো।
আজকের এই আলোচনা সুক্ষ্মভাবে অধ্যয়ন করার মাধ্যমে রেজিশট্রেশন আইনের আগের বিধান ও সংশোধন এর সুবিধা ও এ আইনের মধ্যে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা ভালোভাবে উপলব্ধি করা যাবে। এবার দেখা যাক তুলনামূলক আলোচনা।
পেজ সূচিপত্রঃ রেজিস্ট্রেশন আইন সংশোধন অধ্যাদেশ
রেজিস্ট্রেশন আইন সংশোধন অধ্যাদেশ
রেজিস্ট্রেশন আইন সংশোধন অধ্যাদেশ সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে আমাদের জানা প্রয়োজন
রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ সম্পর্কে। জমি ক্রয় বিক্রয়ে রেজিস্ট্রেশন গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা পালন করে। ১৯০৮ সালে বৃটিশ আমলে এই আইন প্রণয়ন করা করা হয়। তারপর থেকে
নানা পরিবর্তনের মাধ্যমেও এই আইন পাকিস্তান স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত চালু রাখা হয়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৯ মোতাবেক এই আইন
বাংলাদেশে পরবর্তী কোন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত চালু রাখা হয়।
সর্বশেষ ১লা জানুয়ারি ২০২৬ সালে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এই আইনে সংশোধন নিয়ে আসা
হয়েছে। এই আইনের বিধানসমূহ লঙ্ঘনপূর্বক কোন দলিল রেজিস্ট্রি হলে ঐ দলিলকে প্রকৃত
রেজিস্ট্রিকৃত দলিল মর্মে আখ্যায়িত করা যাবে না। সময়ের সাথে সাথে ১৯০৮ সালের সেই
আইনটি পরিবর্তন আনা জরুরি বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। এবার দেখা যাক কোন বিষয় গুলো
পরিবর্তন হয়েছে ও আগে কি ছিলো।
পূর্বের আইনের ধারা ১৭ক সংশোধন
নিবন্ধন আইন, ১৯০৮ এর ধারা ১৭ক তে উল্লেখ করা হয়েছিল বিক্রয় চুক্তি বা বায়না
রেজিস্ট্রিকরণ বিষয় সম্পর্কে। ধারাটির ১ উপধারায় উল্লেখ করা হয় যদি কোন স্থাবর
সম্পত্তি বিক্রয়ের চুক্তি বা বায়না করা হয় তাহলে সেই চুক্তিপত্র অবশ্যই লিখিত,
পক্ষগণের দ্বারা সম্পাদিত ও রেজিস্ট্রিকৃত হতে হবে। আর একই ধারার ২ উপধারায় বলা
হয় এই চুক্তি পত্রটি অবশ্যই চুক্তিপত্র সম্পাদনের ৩০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রির
জন্য দাখিল করতে হবে।
২০২৬ সালে সংশোধনের মাধ্যমে বিধান করা হয়েছে চুক্তি সম্পাদনের ৩০ দিন নয় বরং ৬০
দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রির জন্য দাখিল করতে হবে। রেজিস্ট্রেশন সংশোধন অধ্যাদেশ
জারির মাধ্যমে বায়না রেজস্ট্রি দাখিলের সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। কারণ বায়না করার
পরেও পক্ষগণের মধ্যে এমন চুক্তি না করার সিদ্ধান্ত দেখা দিতে পারে বা অন্য কোন
কারণে দেরি হতে পারে। তাই এই সংশোধনের মাধ্যমে বিষয়টিকে সহজ করা হয়েছে।
পূর্বের আইনের ধারা ২৬ সংশোধন
রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ এর ধারা ২৬-এ বলা হয়েছে বাংলাদেশের বাহিরে সম্পাদিত দলিল
সম্পর্কে। দলিল যদি বাংলাদেশের বাহিরে সম্পাদিত হয় এবং সে দলিল যদি দেশে পৌছাবার
৪ মাসের মধ্যে সেই দলিলটি নিবন্ধনের জন্য দাখিল করা হয় তাহলে সেটি গ্রহনযোগ্য
হবে। এই ধারার ২৬(খ) উপধারায় পূর্বের আইনে ৪ মাসের কথা উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু নতুন সংশোধনের মাধ্যমে সেই সময়টি বাড়িয়ে ৬ মাস করা হয়েছে। অর্থাৎ যদি কোন
ব্যক্তি বাংলাদেশের বাহিরে কোন দলিল সম্পাদিত করে তাহলে দেশে পৌছাবার ৬ মাসের
মধ্যে যদি নিবন্ধনের জন্য দাখিল করে তাহলে সেই দাখিলকৃত দলিল গ্রহণযোগ্য হবে। এই
বিধানটি করা হয়েছে বিদেশে সম্পাদিত দলিল কারকগণের সুবিধার জন্য।
পূর্বের আইনের ধারা ৫২ক সংশোধন
রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ এর ৫২ক ধারা টি সংযোজন করা হয়েছিল ২০০৪ সালের সংশোধন আইন
দ্বারা। সময়ের সাথে এই ধারার কিছু বিষয় সংশোধন করা সমীচীন হয়েছিল। তাই নতুন
অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এটি সংশোধন করা হয়েছে। পূর্বের আইনে ৫২ক ধারাতে বলা
হয়েছিল একটি দলিল রেজিস্ট্রি করার জন্য কোন তথ্য গুলো জমা দিতে হয় সে বিষয়ে।
কিন্তু সেখানে হেবার ঘোষণা বা অন্য ধর্মের ব্যক্তিগত উপহার ঘোষণার কথা উল্লেখ করা
ছিল না। অধ্যাদেশ জারির পর এই বিষয় গুলো যোগ করে বলা হয় যে, যদি এমন ঘোষণার জন্য
দলিল করা হয় তাহলে নিজ নামের সর্বশেষ খতিয়ান, সম্পত্তির মূল্য, সম্পত্তির
প্রকৃতি, নকশা, গত ২৫ বসরের মালিকানার বিবরণ ইত্যাদি তথ্য জমা দিতে হবে।
পূর্বের আইনের ধারা ৬৮ তে সংযোজন
রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ এর ধারা ৬৮ তে নিবন্ধকের ব্যবস্থাপনা বিষয়ক এবং
উপ-নিবন্ধকের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। এই ধারাতে ২ টি উপধারা
যথাক্রমে ১ ও ২ ছিল। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন আইন সংশোধন অধ্যাদেশ প্রণয়নের মাধ্যমে
নতুন একটি উপধারা (৩) সংযোজন করা হয়েছে। এই উপধারায় বলা হয়েছে, পরিদর্শনের
সময় বা অন্যথায় যদি দেখা যায় যে,
আরও পড়ুনঃ সংবিধান সংস্কার - সমস্যা ও প্রস্তাবনা
কোনও দলিল নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা কর্তৃক অনুপযুক্ত ফি, কর, পরিষেবা চার্জ বা
শুল্কের মাধ্যমে নিবন্ধিত হয়েছে, তাহলে তা অসদাচরণ বলে গণ্য হবে এবং সংশ্লিষ্ট
নিবন্ধনকারী কর্মকর্তার কাছ থেকে অনাদায়ী ফি, কর, পরিষেবা চার্জ বা শুল্ক আদায়
করা হবে। নিবন্ধনকারী কর্মকর্তার অসদাচরণ রোধ করার জন্য এই বিধান করা হয়েছে।
পূর্বের আইনের ধারা ৭২-তে সংযোজন
পূর্বের আইনের ধারা ৭২-তে নিবন্ধকের আদেশে উপ-নিবন্ধকের নিবন্ধন করতে অস্বীকৃতি
প্রদর্শন করলে আপীল করার বিধান আছে। এই ধারা তে যথাক্রমে দুইটি ১ ও ২ উপধারা
রয়েছে। ২০২৬ সালের নতুন অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এই ধারা তে আরও একটি উপধারা (১ক)
সংযোজন করা হয়েছে। উপধারা ১ক তে বলা হয়েছে, উপ-ধারা (১) এর অধীনে দায়েরকৃত
আপিলের তারিখ থেকে পঁয়তাল্লিশ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রার কর্তৃক নিষ্পত্তি করা হবে।
এই ধারার ১ উপধারায় বলা হয়েছে যদি উপ-নিবন্ধক কোন দলিল নিবন্ধনের জন্য গ্রহন করতে
অর্থাৎ নিবন্ধন করতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে নিবন্ধকের নিকট আপীল করা যাবে। কিন্তু
আইনে বলা ছিল না এই আপীল নিষ্পত্তি কতদিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হবে। ১ক উপধারা
সংযোজন করার মাধ্যমে সেই সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
পূর্বের আইনের ধারা ৭৩-তে সংযোজন
নিবন্ধন আইনের ধারা ৭৩-তে নতুন সংশোধন অধ্যাদেশ জারির পূর্বে ২ টি উপধারা
যথাক্রমে (১) ও (২) ছিল। কিন্তু সংশোধন অধ্যাদেশ জারির পর নতুন একটি উপধারা (৩)
সংযোজন করা হয়েছে। এই উপধারাটি হলো, উপ-ধারা (১) এর অধীনে দাখিল করা আবেদনপত্র
দাখিলের তারিখ থেকে ত্রিশ দিনের মধ্যে নিবন্ধক কর্তৃক নিষ্পত্তি করা হবে।
আরও পড়ুনঃ নৃশংস হত্যার আইনসম্মত জবাব
অর্থাৎ উপধারা ১ এ বলা হয়েছিল যদি দলিল সম্পাদনকারী বা তার প্রতিনিধি অস্বীকৃতি
জানায় আর তখন যদি উপ-নিবন্ধক সেই কারণে দলিল রেজিস্ট্রি করতে অস্বীকৃতি জানায়
তাহলে দলিলের দাবিদার ঊর্ধবতন রেজিস্ট্রার বা ঐ উপ-নিবন্ধকের কাছে নিবন্ধনের জন্য
দরখাস্ত করতে পারবে। কিন্তু কত দিনের মধ্যে সেটি নিষ্পত্তি করা হবে সেটি বলা
হচ্ছে উপধারা ৩ এর মাধ্যমে।
৭৭ক ধারা নতুন ভাবে সন্নিবেশ
এই অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে নতুন করে ৭৭ক ধারা সন্নিবেশ করা হয়েছে। ৭৭ক ধারা টিতে
মোট ২টি উপধারা রয়েছে। ৭৭ক ধারাটি হলো, ডিজিটালাইজড রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের
ক্ষেত্রে এই আইনের প্রযোজ্যতা।-(১) এই আইনের অন্য কোন বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না
কেন, সরকার কর্তৃক অনুমোদিত কোন সফটওয়্যার ব্যবহার করে বিধি দ্বারা নির্ধারিত
পদ্ধতিতে একটি দলিল ডিজিটালি নিবন্ধিত করা যেতে পারে,
যাতে দলিল উপস্থাপন, নিবন্ধনের জন্য দলিল গ্রহণ, দলিল নিবন্ধন এবং তৎসংশ্লিষ্ট
বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত থাকে। (২) উপ-ধারা (১) এর উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, সরকার
সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা বিধি প্রণয়ন করিবে। এই ধারার মাধ্যমে আধুনিক
ভাবে আইনটিকে সাজানো হয়েছে।
নতুন আইনে ৮০ ধারার প্রতিস্থাপন
১৯৮০ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনের ধারা ৮০ তে বলা হয়েছিল দাখিলের সময় প্রদেয় ফি
সম্পর্কে। ধারাটিতে বলা হয়, দলিল দাখিলের সময় সকল প্রকার ফি প্রদান করা হবে।
সংশোধন অধ্যাদেশে এই ধারাটি প্রতিস্থাপন করে বলা হয়েছে,উপস্থাপনের সময় প্রদেয়
ফি ইত্যাদি। (১) এই আইন এবং দলিল নিবন্ধনের জন্য আপাতত বলবৎ অন্য যেকোনো আইনের
অধীনে সকল ফি, কর,
পরিষেবা চার্জ এবং শুল্ক এই ধরনের দলিল উপস্থাপনের সময় প্রদেয় হবে এবং
নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা তা আদায় করবেন। (২) সরকার সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপনের
মাধ্যমে, ফি, কর, পরিষেবা চার্জ এবং শুল্ক আদায়ের পদ্ধতি এবং এই অধ্যায়ের অধীনে
আদায়কৃত পরিষেবা চার্জ ব্যবহারের বিষয়ে নিয়ম প্রণয়ন করবে।
মন্তব্যঃ রেজিস্ট্রেশন আইন সংশোধন অধ্যাদেশ
রেজিস্ট্রেশন আইন সংশোধন অধ্যাদেশ নিয়ে আজকের আর্টিকেলে এই অধ্যাদেশের ৯৫ শতাংশ
বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। মূল বিষয়বস্তু সমূহ আলাদা করে তুলে ধরা হয়েছে। পুড়নো
আইনের সাথে সংশোধনকৃত আইনের কি পার্থক্য বা কোন বিষয় গুলো পরিবর্তন করা হয়েছে
সেগুলো নিয়ে আলচনা করা হয়েছে।
সংশোধনকৃত আইনটি সময়ের সাথে জরুরি হয়ে পড়েছিল। নতুন কিছু ধারা সংশোধন করার
মাধ্যমে আইনটিকে আরো বেশি আধুনিক করা হয়েছে। উপ-নিবন্ধকের অবহেলায় জরিমানার
শাস্তি থেকে শুরু করে কিছু কাজের সময় বৃদ্ধি করে সাধারণ জনগণের আইনি প্রক্রিয়া
আরো সহজ করা হয়েছে এই অধ্যাদেশে।



আমিন একটিভ নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url